[এটা ২০১৩ এর ফেব্রুয়ারি মাসের ভ্রমণ কাহিনী।]
আমি জীবনে যতগুলো ভ্রমণপিয়াসু ব্যক্তিদের সাথে কথা বলেছি তাদের সবাই একটা কথা বলেছেন, “বান্দরবান বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা”। তাই স্বভাবতই আমারো ইচ্ছা জেগেছিল বান্দরবান ঘুরে আসার। আর আমাদের বুয়েটিয়ান চিটাইঙ্গা গ্রুপ যারা পোংটামি করার জন্য বিখ্যাত তারাও অনেক দিন ধরে বান্দরবানের প্ল্যান করছিল। আমাদের টার্ম ফাইনাল শেষ হবার পর ব্যাটে বলে মিলে যাওয়ায় আমাদের যাত্রার তারিখ ঠিক হল ২৮ জানুয়ারি। যারা যাত্রা করতে মনস্থ করলাম তারা হল অনিক, জাইন, সামির, নিজামি, বাসিত, ফাহিম, নওশাদ এবং আমি। শেষ মুহুর্তে আমাদের সাথে যোগ দিল শাকির বিন মুজিব সামি।
খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে ছুটলাম বহদ্দারহাট টার্মিনালের দিকে। অল্পক্ষণের মধ্যেই সবাই চলে এল। বাসিত লেট করার জন্য বিখ্যাত। ফোন করলে সে বাসায় বসে থেকেই বলে, “আর দুই মিনিট লাগবে” সে পর্যন্ত একটুও দেরী করলো না। দেরী না করে বাসে উঠে পড়লাম। বাসের নাম মনে নেই। ভাড়া লেগেছিল খুব সম্ভবতঃ দেড়শ টাকার মতো।
সকল বাস বা ট্রেন জার্নিতে যেটা হয়, শুরুতেই কিছুক্ষণ খুব মাস্তি চলে। একজন আরেকজনকে পচানোর চেষ্টা করে। আমাদের মধ্যে সেটাতে অগ্রগন্য থাকে অনিক মুহুরী। সবাই খুব ভয়ে ভয়ে থাকে কখন সে কাকে চেপে ধরে। যাকে সে ধরবে সে দুইদিন লজ্জায় মুখ দেখাতে পারবে না। তাই সবাই তাকে খুব পাম দিয়ে চলে। যথারীতি সে আমাদের পঁচিয়ে চলেছে। আমার পাশে বসে থাকা ফাহিম থাকতে না পেরে বলে উঠলো, “অনিকের গল্পগুলোকে ঈশপের গল্পের সাথে তুলনা করা যায়। ঈশপের গল্পের মত উপদেশ না থাকলেও বিনোদন মাস্ট।” তুলনাটা অনিক ভালোভাবে নেয় নি বলাই বাহুল্য।
মোটামুটি সাড়ে দশটার দিকে আমরা পৌছলাম বান্দরবান শহরে। হালকা নাস্তা করে চান্দের গাড়ি ঠিক করলাম। প্রথমে যাবো নীলগিরি, সেখান থেকে রুমা। চান্দের গাড়ি আসলে কিছুই না, জাস্ট ছাদছাড়া জীপগাড়ি। তীব্র বাতাসের মাঝে ছাদছাড়া গাড়িতে উঠলেই মনে ফূর্তি এসে ভর করে। গান আড্ডা ও অনিক মুহুরীর পঁচানি চলছিল বিরতিহীন। রাস্তায় মাঝে মাঝেই আর্মি ক্যাম্প পড়ে, সেখানে গাড়ি থামাতে হয়। আর সুন্দর জায়গা দেখলেই আমরাই গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়ছিলাম বারবার। সাথে আছে বাসিতের ডিএসএলআর আর নিয়নের টিপিক্যাল ক্যামেরা, ছবি তোলা তো আসে! বেশ কিছু সুন্দর স্পটে আমরা ছবি তুললাম। এর মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর জায়গার নাম দে
য়া হল 'অনিক মুহুরী স্পট' (জি স্পটের নামানুসারে)।
য়া হল 'অনিক মুহুরী স্পট' (জি স্পটের নামানুসারে)।
অনিক মুহুরী স্পট
এমনি করে প্রায় পৌনে একটার দিকে পৌছলাম নীলগিরিতে। এটা একটা সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন রিসোর্ট, তাই টিকেট কেটে ঢুকতে হয়। নীলগিরির উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে ২২০০ ফিট। নীলগিরি থেকে আশেপাশের টিলাগুলোর অসাধারণ ভিউ পাওয়া যায়। বর্ষাকালে নীলগিরি থেকে মেঘ ছোয়া যায়। আমরা গিয়েছি শীতের শেষে, তাই মেঘ ছোয়ার সুযোগ হল না। তবে ফেসবুক প্রোফাইল পিকচারের জন্য ভালো ছবি তোলার যেই সুযোগ পেয়েছি তার সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহারে লেগে গেলাম। নীলগিরিতে সকল পর্যটক দল একটা কমন কাজ করেঃ নীলগিরির হেলিপ্যাডে সবাই একসাথে লাফ দিয়ে ছবি তোলে।
নীলগিরিতে উড্ডয়ন
নীলগিরি দেখা শেষ হলে আমরা রওনা দিলাম রুমার পথে। মাঝে অবশ্যই দুপুরের খাওয়া সেরে নিয়েছিলাম। নীলগিরিতে যাবার পথে রেস্টুরেন্ট পড়ে সেখানে যাবার সময় অর্ডার দিয়ে যেতে হয়। আমরাও তাই করেছিলাম। নীলগিরি থেকে রুমার পথ খানিকটা বিরক্তিকর, কারণ প্রচুর ধুলা ওড়ে রাস্তায়। তাছাড়া সকাল থেকে বাস আর চান্দের গাড়ির ঝাঁকুনির কারণে সবাই একটু ক্লান্তও ছিলাম।
রুমায় পৌছে হোটেল ভাড়া করলাম একদিনের জন্য। আর গাইড ঠিক করলাম ১৭০০ টাকায়। গাইডের নাম আপেল মল্লিক, বাঙালি। বেটে গাট্টাগোট্টা কুচকুচে কালো এক কিশোর। মালপত্র রাখতে ও ফ্রেশ হতে চলে গেলাম হোটেল রুমে। তবে আজকের যাত্রা এখানেই শেষ নয়। কারণ কাছেই আছে সাঙ্গু নদী যার উজান বেয়ে কিছুদূর গেলেই আছে এক সুন্দর জলপ্রপাত যার নাম রিঝুক ঝর্ণা। আর রিঝুক ঝর্ণায় যেতে গিয়েই ঘটে গেল আমাদের ভ্রমণের সবচেয়ে মজাদার ঘটনা। এনকা আর ভেরোনিকা। যথাক্রমে স্প্যানিশ ও ইকুয়েডরিয়ান দুই যুবতী। আমাদের সাথে দেখা হয়ে গেল যখন আমরা সাঙ্গু নদীতে নৌকা ভাড়া করতে যাচ্ছি। দুই সাদা চামড়া গোলাপী ঠোঁট যুবতীর দিকে সবাই সরস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার মাঝেই তারা আমাদের অনুরোধ করলো আমরা যেই নৌকা ভাড়া করেছি তাতে তাদের উঠতে দেব কি না। আমাদের গানের পাখি নিয়নই তাদের আমন্ত্রণ জানালো নৌকায়, “Yeah off course”। নৌকায় দুই যুবতী একদম সামনে গিয়ে বসলো। তার মুখোমুখি বসলো জাইন আর বাসিত। তার পিছনেই বসলো নিয়ন ও অনিক মুহুরী। চার ইংরেজী বিশারদ দুই বিদেশিনীর সাথে গল্প জুড়ে দিল। আর আমরা বাকিরা পিছনে বসে মজা দেখতে লাগলাম। শুধু নিজামি মনমরা হয়ে বসে রইল, কারণ কষ্ট করে বুঝে নিন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা বুঝে গেলাম যে এই দুই বিদেশিনী বিশেষতঃ ভেরোনিকা উচ্চ মানের Flirting mistress। উদাহারণ দিলে বুঝা যাবে। ভেরোনিকা জিজ্ঞাসা করলো, “How old are you?” জাইন উত্তর দিল, “We all are twenty three years old.” ভেরোনিকা, “Very good. Twenty three years old boys are too good.” তাদের সাথে আরো কিছুক্ষণ কথা বলে জানা গেল তারা বিশ্বভ্রমণে বের হয়েছে। তারা বাংলা পারে না এবং বুঝে না। একটু পর আমরা লক্ষ্য করলাম আমরা যখন নিজেদের মাঝে কথা বলছিলাম তখন তাদের চোখ মুখ দেখে মনে হচ্ছে তারা বুঝতে পারছে। তারপর আমরা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে শুরু করলাম।
সাঙ্গু নদীর খাড়ু পানিতে দাঁড়িয়ে(সর্ববামে এনকা ও ভেরোনিকা)
রিঝুক ঝর্ণায় পৌছুতে প্রায় পাঁচটা বেজে গেল। সেখানে ছবি তোলা হল। আমরা ছবি তুললাম, বিদেশী যুবতীদ্বয় ছবি তুলল, তাদের অজান্তে তাদের বিশেষ বিশেষ এঙ্গেলেরও ছবি তুলে ফেলল আমাদের মধ্যেই এক বদ ব্যক্তি। ঝর্ণার পানি মোটেই স্বস্তি দায়ক না, বরফ শীতল। ঝর্ণার পানিতে পা ডুবিয়ে বসে থাকার চেষ্টা করেছিলাম। সুবিধা করতে পারলাম না। পা অবশ হয়ে আসার যোগাড়। বেশীক্ষণ থাকা হল না ঝর্ণার কাছে। শীতকাল এর শেষের দিক, ঝুপ করে সন্ধ্যা নেমে যায় চারিদিকে। নৌকায় উঠে রুমা ঘাটের দিকে ছাড়তেই চারিদিক অন্ধকার হয়ে এল, সাথে বইতে শুরু করলো শীতল হাওয়া। এই সময় সর্বোচ্চ মজা লুটলো আমাদের গাইড আপেল। সে জানালো তার সাথে কোন শীতের কাপড় নেই এবং তার অনেক শীত করছে। শুনে দুই বিদেশিনী তাকে আদর করে নিজেদের মাঝখানে বসাল এবং দুইপাশ থেকে দুজন জড়িয়ে ধরে উষ্ণতা দিতে লাগলো। আমরা সবাই হাসতে লাগলাম। জাইন আপেলের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো, “আপেইল্লা, মজা নেওয়ার কথা আমাদের, মজা নিতেছস তুই। তোরে দুইশ টাকা কম দিবো।” আমরা সবাই মজা পেলেও গানের পাখির মন বেদনায় ভরে উঠলো। ভেরোনিকাকে তার আসলেই ভালো লেগে গিয়েছিল।
রিঝুক ঝর্ণা(শীতকাল বলে পানি খুব একটা নেই)
হঠাৎ নৌকা আটকে গেল। শীতকালে সাঙ্গু নদীর পানি একদমই কমে যায় কোথাও গলা পানির বেশি থাকে না। তার উপর এখন ভাটা। আর ছোট্ট একটা নৌকাতে আমরা চড়ে বসেছি পনের জন। ফলে নৌকা গিয়েছে আটকে। মাঝি বললো যে এখানে পানি কম। আমাদের নেমে বেশ খানিকটা হেঁটে যেতে হবে। হাঁটতেও সমস্যা হবে না। কারণ আমাদের নৌকার পাশ দিয়ে তখন বাশ ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। (পাহাড়ী বন থেকে বাশ ট্রাকে করে শহরে নিয়ে সমস্যা বলে বাঁশ নদী দিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। অনেকগুলো বাঁশ একসাথে বাঁধা থাকে বলে তার উপরে বিশ-পঁচিশ জন মানুষ সহজেই দাঁড়িয়ে থাকতে পারে।) চারদিক অন্ধকার। আকাশে চাঁদ তখন শুক্লপক্ষের সাত বা আটে আছে। তাই চাঁদের আলোও খুব বেশি ছিল না। তবে বান্দরবান ভ্রমণের প্রস্তুতি হিসেবে আমরা বেশ কয়েকটি টর্চ নিয়ে এসেছিলাম। সেই টর্চের আলোয় আমরা বাঁশের উপর উঠে এলাম এবং হাঁটতে শুরু করলাম। এইবার নিজামীর ভাগ্যের শিকে ছিড়লো। এনকা নিজামীর হাত ধরে বাঁশের উপর হাঁটছিল। নিজামীর হাতে হাত ঘষতে ঘষতে এনকা বলে উঠলো, “Oh! Your hand is so warm!” নিজামি তো আনন্দে আত্মহারা। সেই সময় ভেরোনিকার পাণি কে গ্রহণ করেছিল আমার মনে নেই।
আমি আর সামি পাশাপাশি হাঁটছিলাম। আমি সামিকে বললাম, “সামি খেয়াল করছিস, ঝর্ণার পানি বরফের মত ঠাণ্ডা ছিল। কিন্তু নদীর পানি গরম।” সামি বলে, “কেউ হয় তো পাদ দিছে।” আমি একটা জোকস বলার চেষ্টা করলাম, “একদা টাংকি ভাই সাঙ্গু নদীর পানিতে পাদ দিলেন। অমনি নদীর পানি গরম হয়ে গেল।” সামি যোগ করলো, “এ থেকে আমরা বুঝতে পারি ‘টাংকি ভাই একটা মাল’ ”। (টাংকি ভাই হল আমাদের জনৈক ভ্রমণসঙ্গীর nickname) ফাহিম আমাদের পিছনেই ছিল। হাসতে হাসতে তার অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। বাকিরা তখন দুই বিদেশী যুবতীকে নিয়েই ব্যস্ত।
যাই হোক। আমরা আবার নৌকায় উঠলাম। আপেল যথারীতি দুই বিদেশিনীর উষ্ণতার জালে আবদ্ধ হয়ে বসলো। বাকিরাও বসে পড়লাম। সোয়া আটটার দিকে রুমা ঘাটে পৌছুলো নৌকা। দেড়শো টাকা নৌকার ভাড়া আমরাই দিলাম, বিদেশিনীরাও ন্যুনতম যতটা ভদ্রতা না দেখালেই নয় ততটুকু দেখিয়ে চুপ করে গেল। ভাড়া দিয়ে হোটেলের দিকে রওনা দিলাম আমরা। জানা গেল আমাদের সামনের হোটেলেই উঠেছে এনকা ও ভেরোনিকা। হোটেলে ঢুকে যাবার আগে আমাদের একসাথে ডিনার করার অফার দিল দুই যুবতী। আমরাও সানন্দে রাজী হয়ে গেলাম।
হোটেল রুমে ঢুকেই গানের পাখি প্রস্তাব করে বসলো, “চল, এই দুইজনের সাথে সারারাত গল্প করি।” (চলবে)
Comments
Post a Comment